ট্রেন তখন ঝড়ের বেগে ছুটে ছলেছে প্রত্ত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মায়াবি শূন্যতা ভেদ করে। আমার মন ছুটেছে তার পিছু পিছু। মুম্বাই-গামী দুরন্ত একস্প্রেস । চারপাশে গ্রামিন সৌন্দর্য্যের বাহার। তখন প্রায় বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। আকাশে খেলা করছিল টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে নাম-নাজানা গাছ গুলোর দীর্ঘ্য নিঃসঙ্গতা ভেঙ্গে ছুটে চলেছি। আকাশে ফিকে হয়ে আসা রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। হাল্কা আমেজের এলোমেলো অন্যমনষ্কতায় ভরে উঠছিল সময়। হঠাৎ ছোখ পড়ল দূরের আকাশের দিকে। দেখলাম কিছু নবাগত মেঘের সারি আকাশের একটা কোণের আংশ জবর-দখল করে বসে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের আধিপত্য ছড়িয়ে পড়ল সারা আকাশে। মনে হচ্ছিল কোন বিরাট শিশু যেন আকাশে ধুষর মাটি নিয়ে খেলা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনুভব করলাম চারিদিক একটা গভীর স্তব্ধতায় ছেয়ে গাছে। মন ভরেছে রোমাঞ্চে। প্রতিটি বৃক্ষ যেন প্রকৃতির মহারাজার পদার্পণের ভয়ে তটস্থ। সেই আনুভুতি জেন শব্দে ব্যাক্ত করার অতিত। শাহিত্যের সীমারেখা শেষ হয়ে গাছে। এ যেন শুধু অনুভূতি আর অনুভূতি!
খামখেয়ালী-পনায় সাধারন মানুষকে চিরকাল-ই আমি টেক্কা দিয়ে এসেছি। তাই সাভাবিক ভাবেই আমার ভেতরের খামখেয়ালী সত্ত্বাটা এই অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের মায়ায় আবার জেগে উঠেছিল। দিগন্ত বিস্তৃত ছোট ছোট ঘাস, মাঝে মাঝে বুকে ব্যাথা নিয়ে অপেক্ষা করা বাবলা গাছ, মিশমিশে ঘন মেঘ আর গভীর স্তব্ধতায় ভরা বাতাস। নাহ! আর আটকানো যাচ্ছেনা নিজেকে। এই পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পন না করার ধৃষ্টতা আমার পাগল মনের নেই! যে করেই হোক ট্রেন থেকে নেমে এইখানে কিছুক্ষণ কাটাতেই হবে।
Noetics নামক প্যারাসায়েন্স-এর একটি শাখা আছে। তার মূল বক্তব্য হল যদি কেউ খুব মনে প্রাণে কোন ঘটনা ঘটার জন্য কামনা করে, তাহলে সেটা ঘটার সম্ভবনা বেড়ে যায়। আমার খেত্রেও কতকটা তাই-ই হল। কাছেই একটা ষ্টেশন এসে পড়ল এবং ট্রেনটাও যেন আমার জন্যই কোন অজ্ঞাত কারণে দাঁড়িয়ে পড়ল ষ্টেশনে। আর আমায় রাখে কে! পিঠের আর হাতের ব্যাগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লাম।
ষ্টেশনের নাম বাস্তাবপুর। প্রত্যন্ত গ্রামের অনামি পরিত্যক্ত ষ্টেশন। প্ল্যাটফর্মটা বেশ নিছু আর ভাঙাচোরা।বহুকাল পূর্বের করা কংক্রিট গুলো এখন যেন ফোকলা দাদুর মতো ইট-পাথর বার করা চেহারায় হাসছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘাসের ছোপ আর অনাদরে বেড়ে ওঠা বুনো ঝোপের সারি। এরাই বোধহয় এই নিভৃত ষ্টেশনের একমাত্র সঙ্গী। সব মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভূত সুন্দর পরিবেশ।
ট্রেনটা ষ্টেশন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ে ট্রেনের যাত্রীরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমিও মিষ্টি হেসে তাদের হাত নাড়লাম। ট্রেনটা ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে যেতেই ষ্টেশনের প্রকট শূন্যতাটা অনুভাব করলাম। চত্ত্বরটা প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। বেশ কিছুটা দূরে ষ্টেশনের শ্রমিকদের একটা আপরাহ্ন আড্ডা বসেছে। আশেপাশে কয়েকটা আনকোরা কুকুর খেলা করছিল। পিছনে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায় ছোট বড় গাছের শ্যামলা আভরন। চারধারটা দেখতে দেখতে একটা অন্যরকম দৃশ্য ছোখে পড়ল। ষ্টেশনের একপ্রান্তে নীল রঙের পোশাক পরে কেউ দাঁরিয়ে। দূর থেকে রংটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নীল রঙের সালওয়ার কামীজ পরে দাঁড়িয়ে একটি অল্প বৈশী মেয়ে। চেহারায় যেন একাকিত্ত মাখা। গায়ের রং এ উচ্চবিত্ত পরিবারের আভাস। আমি কাছাকাছি আসতেই তার দৃষ্টি আমার চোখে এসে পড়ল। এইরকম দৃষ্টিপাতে অনভ্যস্ত হওয়ার দরুন আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তার চোখের কোণে যেন একটা সরল চাঞ্চল্য উঁকি মারছিল। সেই এক পলকের চাহনিই যেন আমার মনটাকে পাগল করে দিল। কাঠের পুতুলের মত অসহায় আত্মসমর্পণ করলাম মুহূর্তটার কাছে। এইরকম আরো কিছু অপ্রস্তুত মুহূর্তের পর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম : "নমস্কার। আমার নাম আকাশ। আপনি কি এই জায়গাটা চেনেন?"
মেয়েটি বলল : "নানা আমিও এখানে প্রথম আসছি। আর আমার নাম বৃষ্টি। তা আপনি কোথা থেকে আসছেন?"
তার কথা গুলো যেন একটাও বুঝতে পারলাম না! আমার তখন সমস্ত মনোযোগ তার চোখের গভীরতায় আত্মহারা। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব। কিন্তু কি যে বলব সেটা কিছুতেই ঠাওর করে উঠতে পারছিলাম না। খুবই একটা অস্বস্থিকর পরিবেশ তৈরী হয়ে গেছিল। কিন্তু শেষমেষ তা আর হলনা, কারণ হঠাৎ যেন আমার মনে হতে লাগল আমার কাঁধে হাত দিয়ে কেউ আমায় পিছন থেকে ডাকছে। পেছনে মাথাটা ঘোরাতেই যা দেখলাম প্রথমে সেটা বিশ্বাস হচ্ছিল না।
দেখলাম আমি ট্রেনের সাইড আপ্পার বার্থে শুয়ে আছি আর প্যান্ট্রিকারের কর্মি আমার সামনে তুলে ধরেছে বিকেলের চা-এর কাপ।
হায় রে! এ কি তাহলে স্বপ্ন ছিল? চা-এর কাপটা নিয়ে উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে পড়লাম। চোখ পড়ল জানলার দিকে। কি আঃশ্চর্য! এ তো স্বপ্নে যা দেখেছি পুরো তাই!
বিস্তৃত নিস্তব্ধ ঘাসভূমি, ধূষর মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ! আমার ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। হাল্কা ঝাঁকুনি হাওয়ায় বুঝতে পারলাম ট্রেনটা ব্রেক কষেছে। আর কয়েকবার ঝাঁকুনির পর ট্রেনটা পুরোপুরি থেমে গ্যাল। সহযাত্রীরা কেউ কেউ বলল : "কেউ হয়তো চেন টেনেছে। "
আমি আর দেড়ি করলাম না। তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। একটু পরেই ট্রেনটা আমায় ফেলে বেড়িয়ে গেল। লাইনের উপর মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনটার আওয়াজ যেন অনেক্ষন কানে লেগেছিল। তাকালাম চারধারে। আকাশ জুড়ে মেঘের গম্ভির আবেশ আমার মন কে ছেয়ে ফেলেছিল। আবার যেন অনুভব করলাম সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের হাতছানি। সেই অনবদ্য অনুভূতির ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে এগোতে থাকলাম।
যেতে যেতে ভাবছিলাম স্বপটা কি শুধু স্বপ্নই ছিল? আমার মন কিন্তু বলছিল ওটা যেন শুধু স্বপ্ন নয়, ওটা
ভবিষ্যতের-ই পূর্বাভাস। এইসব ভাবতে ভাবতে কেন জানিনা মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। দূর দিগন্ত থেকে ফিরে আসা পাখির ডানার ক্লান্তি ঘনিয়ে উঠছিল মনের আনাচে-কানাচে। মনে মনে ভাবলাম, নাহ! একটা সাধারন স্বপ্নকে এতটা পাত্তা দেওয়া উচিত হচ্ছে না। এইসব এলোমেলো চিন্তা মাথা টাকে একদম ভরিয়ে তুলেছিল। হঠাৎ কিসে যেন জোরে ধাক্কা খেলাম! মাথায় বেশ লাগল।অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁঠতে হাঁঠতে আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি একটা ষ্টেশনের এত কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। চোখ খুলে দেখলাম ধাক্কা খেয়েছি ষ্টশনের নাম লেখা একটা বড় সাইনবোর্ডে।
সাইনবোর্ডে বড় বড় করে নীল অক্ষরে লেখা : স্বপ্নপুর!
নীল রংটা যেন আমার ব্যাথাটাকে আরো গভীর করে তুলল।
হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল।
বৃষ্টি নামল বুকে।
বৃষ্টি নামল চোখে।
কিন্তু বৃষ্টির আওয়াজের মধ্যেই যেন কেউ পিছন থেকে বলে উঠল : "আপনার লাগেনি তো?"
যুবতী কন্ঠস্বর! পিছনে ফিরে জলে ভেজা ঝাপসা চোখে দেখলাম একটু দুরে একটা নীল ছায়া মুর্তি।
আমার যেন ঘোর কাটল!
খামখেয়ালী-পনায় সাধারন মানুষকে চিরকাল-ই আমি টেক্কা দিয়ে এসেছি। তাই সাভাবিক ভাবেই আমার ভেতরের খামখেয়ালী সত্ত্বাটা এই অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের মায়ায় আবার জেগে উঠেছিল। দিগন্ত বিস্তৃত ছোট ছোট ঘাস, মাঝে মাঝে বুকে ব্যাথা নিয়ে অপেক্ষা করা বাবলা গাছ, মিশমিশে ঘন মেঘ আর গভীর স্তব্ধতায় ভরা বাতাস। নাহ! আর আটকানো যাচ্ছেনা নিজেকে। এই পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পন না করার ধৃষ্টতা আমার পাগল মনের নেই! যে করেই হোক ট্রেন থেকে নেমে এইখানে কিছুক্ষণ কাটাতেই হবে।
Noetics নামক প্যারাসায়েন্স-এর একটি শাখা আছে। তার মূল বক্তব্য হল যদি কেউ খুব মনে প্রাণে কোন ঘটনা ঘটার জন্য কামনা করে, তাহলে সেটা ঘটার সম্ভবনা বেড়ে যায়। আমার খেত্রেও কতকটা তাই-ই হল। কাছেই একটা ষ্টেশন এসে পড়ল এবং ট্রেনটাও যেন আমার জন্যই কোন অজ্ঞাত কারণে দাঁড়িয়ে পড়ল ষ্টেশনে। আর আমায় রাখে কে! পিঠের আর হাতের ব্যাগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লাম।
ষ্টেশনের নাম বাস্তাবপুর। প্রত্যন্ত গ্রামের অনামি পরিত্যক্ত ষ্টেশন। প্ল্যাটফর্মটা বেশ নিছু আর ভাঙাচোরা।বহুকাল পূর্বের করা কংক্রিট গুলো এখন যেন ফোকলা দাদুর মতো ইট-পাথর বার করা চেহারায় হাসছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘাসের ছোপ আর অনাদরে বেড়ে ওঠা বুনো ঝোপের সারি। এরাই বোধহয় এই নিভৃত ষ্টেশনের একমাত্র সঙ্গী। সব মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভূত সুন্দর পরিবেশ।
ট্রেনটা ষ্টেশন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ে ট্রেনের যাত্রীরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমিও মিষ্টি হেসে তাদের হাত নাড়লাম। ট্রেনটা ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে যেতেই ষ্টেশনের প্রকট শূন্যতাটা অনুভাব করলাম। চত্ত্বরটা প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। বেশ কিছুটা দূরে ষ্টেশনের শ্রমিকদের একটা আপরাহ্ন আড্ডা বসেছে। আশেপাশে কয়েকটা আনকোরা কুকুর খেলা করছিল। পিছনে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায় ছোট বড় গাছের শ্যামলা আভরন। চারধারটা দেখতে দেখতে একটা অন্যরকম দৃশ্য ছোখে পড়ল। ষ্টেশনের একপ্রান্তে নীল রঙের পোশাক পরে কেউ দাঁরিয়ে। দূর থেকে রংটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নীল রঙের সালওয়ার কামীজ পরে দাঁড়িয়ে একটি অল্প বৈশী মেয়ে। চেহারায় যেন একাকিত্ত মাখা। গায়ের রং এ উচ্চবিত্ত পরিবারের আভাস। আমি কাছাকাছি আসতেই তার দৃষ্টি আমার চোখে এসে পড়ল। এইরকম দৃষ্টিপাতে অনভ্যস্ত হওয়ার দরুন আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তার চোখের কোণে যেন একটা সরল চাঞ্চল্য উঁকি মারছিল। সেই এক পলকের চাহনিই যেন আমার মনটাকে পাগল করে দিল। কাঠের পুতুলের মত অসহায় আত্মসমর্পণ করলাম মুহূর্তটার কাছে। এইরকম আরো কিছু অপ্রস্তুত মুহূর্তের পর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম : "নমস্কার। আমার নাম আকাশ। আপনি কি এই জায়গাটা চেনেন?"
মেয়েটি বলল : "নানা আমিও এখানে প্রথম আসছি। আর আমার নাম বৃষ্টি। তা আপনি কোথা থেকে আসছেন?"
তার কথা গুলো যেন একটাও বুঝতে পারলাম না! আমার তখন সমস্ত মনোযোগ তার চোখের গভীরতায় আত্মহারা। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব। কিন্তু কি যে বলব সেটা কিছুতেই ঠাওর করে উঠতে পারছিলাম না। খুবই একটা অস্বস্থিকর পরিবেশ তৈরী হয়ে গেছিল। কিন্তু শেষমেষ তা আর হলনা, কারণ হঠাৎ যেন আমার মনে হতে লাগল আমার কাঁধে হাত দিয়ে কেউ আমায় পিছন থেকে ডাকছে। পেছনে মাথাটা ঘোরাতেই যা দেখলাম প্রথমে সেটা বিশ্বাস হচ্ছিল না।
দেখলাম আমি ট্রেনের সাইড আপ্পার বার্থে শুয়ে আছি আর প্যান্ট্রিকারের কর্মি আমার সামনে তুলে ধরেছে বিকেলের চা-এর কাপ।
হায় রে! এ কি তাহলে স্বপ্ন ছিল? চা-এর কাপটা নিয়ে উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে পড়লাম। চোখ পড়ল জানলার দিকে। কি আঃশ্চর্য! এ তো স্বপ্নে যা দেখেছি পুরো তাই!
বিস্তৃত নিস্তব্ধ ঘাসভূমি, ধূষর মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ! আমার ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। হাল্কা ঝাঁকুনি হাওয়ায় বুঝতে পারলাম ট্রেনটা ব্রেক কষেছে। আর কয়েকবার ঝাঁকুনির পর ট্রেনটা পুরোপুরি থেমে গ্যাল। সহযাত্রীরা কেউ কেউ বলল : "কেউ হয়তো চেন টেনেছে। "
আমি আর দেড়ি করলাম না। তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। একটু পরেই ট্রেনটা আমায় ফেলে বেড়িয়ে গেল। লাইনের উপর মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনটার আওয়াজ যেন অনেক্ষন কানে লেগেছিল। তাকালাম চারধারে। আকাশ জুড়ে মেঘের গম্ভির আবেশ আমার মন কে ছেয়ে ফেলেছিল। আবার যেন অনুভব করলাম সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত সৌন্দর্য্যের হাতছানি। সেই অনবদ্য অনুভূতির ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে এগোতে থাকলাম।
যেতে যেতে ভাবছিলাম স্বপটা কি শুধু স্বপ্নই ছিল? আমার মন কিন্তু বলছিল ওটা যেন শুধু স্বপ্ন নয়, ওটা
ভবিষ্যতের-ই পূর্বাভাস। এইসব ভাবতে ভাবতে কেন জানিনা মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। দূর দিগন্ত থেকে ফিরে আসা পাখির ডানার ক্লান্তি ঘনিয়ে উঠছিল মনের আনাচে-কানাচে। মনে মনে ভাবলাম, নাহ! একটা সাধারন স্বপ্নকে এতটা পাত্তা দেওয়া উচিত হচ্ছে না। এইসব এলোমেলো চিন্তা মাথা টাকে একদম ভরিয়ে তুলেছিল। হঠাৎ কিসে যেন জোরে ধাক্কা খেলাম! মাথায় বেশ লাগল।অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁঠতে হাঁঠতে আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি একটা ষ্টেশনের এত কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। চোখ খুলে দেখলাম ধাক্কা খেয়েছি ষ্টশনের নাম লেখা একটা বড় সাইনবোর্ডে।
সাইনবোর্ডে বড় বড় করে নীল অক্ষরে লেখা : স্বপ্নপুর!
নীল রংটা যেন আমার ব্যাথাটাকে আরো গভীর করে তুলল।
হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল।
বৃষ্টি নামল বুকে।
বৃষ্টি নামল চোখে।
কিন্তু বৃষ্টির আওয়াজের মধ্যেই যেন কেউ পিছন থেকে বলে উঠল : "আপনার লাগেনি তো?"
যুবতী কন্ঠস্বর! পিছনে ফিরে জলে ভেজা ঝাপসা চোখে দেখলাম একটু দুরে একটা নীল ছায়া মুর্তি।
আমার যেন ঘোর কাটল!